অপসংস্কৃতি রোধে চাই সম্মিলিত প্রয়াস – সভাপতি  মুহম্মদ আলতাফ হোসেন

অপসংস্কৃতি রোধে চাই সম্মিলিত প্রয়াস – সভাপতি  মুহম্মদ আলতাফ হোসেন

মানুষ কোন না কোন সংস্কৃতিতে জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে। আমরা মূলত সাংস্কৃতিক বলয়ের বাইরের কেউ নই। সেদিক থেকে বলা যায়- আমরা
যা তাই হচ্ছে সংস্কৃতি। বায়ু সমুদ্রে ডুবেও আমরা যেমন ভুলে যাই বায়ুর অস্তিত্বের কথা তেমনি সাংস্কৃতিক বলয়ে বেড়ে উঠেও আমরা ভুলে যাই
আমাদের সংস্কৃতির কথা। সংস্কৃতি একটি পরিশ্রুত জীবনচেতনা। ব্যক্তিচিত্তেই এর উদ্ভভ ও বিকাশ। এ কখনো সামগ্রিক বা সমবায় সৃষ্টি হতে
পারে না। এ জন্য দেশে কালে এর প্রসার আছে কিন্তু বিকাশ নেই। অর্থাৎ এ জাতীয় কিংবা দেশীয় সম্পদ হতে পারে কিন্তু ফসল হবে
ব্যক্তিমনের। কেননা সংস্কৃতি ও কাব্য চিত্র বৈজ্ঞানিক অবিক্রিয়ার মতো স্রষ্টার সৃষ্টি। কৃতিত্ব স্রষ্টার বা উদ্ভাবকের। তা অনুকৃত বা অনুশীলিত
হয়ে দেশে পরিব্যপ্ত ও জাতে সংক্রমিত হতে পারে এবং হয়ও। সমগ্র জাতির চিন্তাধারা ভাবধারা ও কর্মধারার গৌরব ও সমুন্নতি তিল তিল
সফল করে সৃষ্টি হয় সংস্কৃতির ধারা। সমগ্র জাতির চিন্তাধারা ভাবধারা ও কর্মধারার গৌরবময় প্রতিচ্ছবিই হল তার সংস্কৃতি।
মানবীয় আচার পদ্ধতি শিক্ষা দীক্ষা মানসিক উন্নতি পারিপাশ্বিকতার প্রভাব এসবের ধারা সমন্বয়ে সৃষ্ট এক অপূর্ব জীবনধারাই হচ্ছে সংস্কৃতি।

সংস্কৃতির মূল কথা হল নিজেকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে গড়ে তোলা এবং অপরের নিকট নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা। জন্মের সময় আমরা
একটি জীব হয়ে জন্মাই। কিন্তু সংস্কৃতিই আমাদের মানুষে পরিণত করে। পরিণত করে সামাজিক জীবে। সংস্কৃতি দিয়েই মানুষ মূল্যবোধ,
ধ্যান-ধারণার, মন-মানসিকতার অধিকারী হয়। বিদগ্ধ রুচির সুশীল মানুষে পরিণত হয়। ইংরেজী ‘Culture’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হল
সংস্কৃতি। ইংরেজি ‘Culture’ শব্দটি ল্যাটনি শব্দ ‘Colere’ থেকে এসেছে। ‘Colere’ শব্দের অর্থ হল কর্ষণ করা। সর্বপ্রথম ইংরেজি সাহিত্যে
‘Culture’ শব্দটি ব্যবহার করেন ফ্রান্সিস বেকন। তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেন ষোল শতকের শেষার্ধে।
এ যাবৎ সংস্কৃতির সর্বজন গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা কেউ প্রদান করতে পারেনি। সংস্কৃতির ধারণা খুবই ব্যাপক। কাজেই এক কথায় এর কোন সংজ্ঞা
দেওয়া চলে না। তারপরও সংস্কৃতির বহুল আলোচিত একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ই. বি টেইলর। তিনি বলেছেন, “ জ্ঞান-বিজ্ঞান,
আচার-বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতিবোধ, আইন-কানুন এবং অনুশীলন ও অভ্যাস যেসব মানুষ কোন এক সমাজের পরিবেশে আয়ত্ব করে সেসবের
সমষ্টিই হল সংস্কৃতি।‍ ” ‍সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা, প্রকৃতি সংসারও মানব সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির
শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা, কাব্য পাঠের মারফতে ফুলের ফোটায়, নদীর ধাওয়ায়, চাঁদের চাওয়ায় বাঁচা, আকাশের
নীলিমায় তৃণগুল্মের শ্যামলিমায় বাঁচা, বিরহীর নয়নজলে মহরতের জীবনদানে বাঁচা, প্রচুরভাবে, গভীরভাবে বাঁচা, বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে
বাঁচা। সংস্কৃতি আমাদের জীবন চেতনা।
গভীর অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে পরিশীলিত জীবনবোধ। শিক্ষা ও সভ্যতার আলোকতীর্থে স্নাত হয়ে এ জীবনবোধ জন্ম নিয়ে থাকে। সংস্কৃতির মধ্যে
যেমন আছে তার সামগ্রিকতার সমানাধিকার তেমনি আছে তার কৃতিত্বময়তার দিক। যে জাতি জীবিত আছে সে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি করে চলেছে
একটি জীবন্ত সংস্কৃতির বহমান ধারা। সংস্কৃতি জাতীয় প্রাণময়তার সামগ্রিক অভিব্যক্তি। মানুষ তার কথায়-বার্তায়, চলনে-বলনে, পোশাকে-
পরিচ্ছদে, খেলা-ধুলায়, আমোদ-প্রমোদে, প্রতি মুহূর্তে তার বিচিত্র সংস্কৃতির ধারা রচনা করে চলেছে। রক্ষা করে চলেছে সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত
প্রবহমানতা। যে জাতির সংস্কৃতির রূপান্তর বা ক্রমবিবর্তন নেই তার সংস্কৃতি মৃত, সে জাতিও মৃত। কারণ সংস্কৃতির মধ্যেই ধ্বনিত-
প্রতিধ্বনিত হয় সমগ্র জাতির প্রানের স্পন্দন।
অপসংস্কৃতি কী এবার আসা যাক সে প্রসঙ্গে। সংস্কৃতির বিপরীত হল অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতি জাতির এক মানসিক ব্যাধি। এ অসুন্দরেরই
ছদ্মবেশ। এর স্পর্শে মানুষের মন কলুষিত হয়। পরিশীলিত, মার্জিত ও উন্নতবোধের হয় অপমৃত্যু। অপসংস্কৃতি অসুন্দরের জন্ম দেয়। চিন্তায়
কর্মে ও আচরণে জীবনের অসুন্দর ও অশোভন অভিব্যক্তিই হল অপসংস্কৃতি। বিদেশি সংস্কৃতিকে আমরা একবাক্যে অপসংস্কৃতি বলে অবিহিত
করে থাকি। আসলে কথাটা সর্বাংশে ঠিক নয়। বিদেশের সবকিছুই আমাদের জন্য অপসংস্কৃতি তা নয়। তবে বিদেশের কোন কিছুকে গ্রহণ
করার আগে দেখতে হবে তা আমাদের জীবনকে সুন্দর ও উন্নত করছে কিনা। যা আমাদের জীবনকে পরিশীলিত করে তা অপসংস্কৃতি নয়।
কিন্তু আমরা যদি ডিসকো গান, নাচ পাশ্চাত্য মডেলের পোশাকের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি তাহলে সেটা স্বাভাবিকভাবেই অপসংস্কৃতি হবে।
ভাষাও সংস্কৃতির অংশ। ভাষার ক্ষেত্রে যেমন মিথস্ক্রিয়া হয় তেমনি আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও অবলীলায় ঘটে মিথস্ক্রিয়া। নদীর
জল সমুদ্রে মিশার ফলে যেমন তা আর সহজে আলাদা করা যায় না, তেমনি অন্য দেশের সংস্কৃতিও । তবে কথা থাকে যে, তা সত্যিকার অর্থেই
গ্রহণযোগ্য কিনা এবং তা আমাদের সংস্কৃতির সাথে মানানসই কিনা কিংবা আমাদের সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ কিনা।
বাংলার সংস্কৃতির মূলে রয়েছে চমকপ্রদতা। মৌলিক সংস্কৃতি মানেই সৃজনধর্মী। এজন্য সংস্কৃতি কখনো পুরনো হতে পারে না। বাংলার
সংস্কৃতির উদ্ভবের মূলে রয়েছে তার অফুরন্ত প্রাণ-প্রাচুর্য্য এবং তার প্রকৃতির অবারিত দাক্ষিণ্য। আমরা বাঙালিরা সংস্কৃতিবান হয়েছি, এগিয়ে
চলেছি সৃজন করে নয়, গ্রহণ করেই। আমাদের ধর্ম এসেছে উত্তর ভারত ও আরব থেকে। ভাষাটাও উত্তর ভারতের। প্রশাসনিক ঐতিহ্যও উত্তর
ভারত, উত্তর এশিয়া ও ইউরোপ থেকে পাওয়া। আজকের ব্যবহারিক জীবনের সব উপকরণ এবং মানস জীবনের সব প্রেরণা এসেছে ইউরোপ
থেকে। আর্য, শক, হুন্দল, পাঠান, মোঘল, ইংরেজ – বাঙালি কাউকেই দূরে সরিয়ে রাখেনি। সে সবাইকে গ্রহণ করেছে। সকলের সংস্কৃতি তিল
তিল সোনা সংগ্রহ করে সে রচনা করেছে অনবদ্য তিলোত্তমা মূর্ত-বাংলা বা বাঙালি সংস্কৃতি। এখানেই বাঙালি সংস্কৃতির অনন্যতা।
এদেশীয় সংস্কৃতির পরিচয়ের প্রারম্ভেই বলতে হয় যে- প্রকৃতির বিচিত্র মহিমাই বাংলার সংস্কৃতিকে বিশিষ্ট মর্যাদায় ভূষিত করেছে। বাঙালি
সংস্কৃতির মূলে আছে এক সুগভীর ধ

(Visited 1 times, 1 visits today)





%d bloggers like this: