বরগুনা প্রতিনিধি:: বরগুনায় মহামারি আকার ধারণ করেছে ডায়রিয়া। এক যুগের রেকর্ড ছাড়িয়ে জেলার পাঁচ হাজারেরও অধিক মানুষ ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছেন। এরই মধ্যে আটজন মারা গেছেন। প্রতিদিন নতুন করে সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসছে আক্রান্ত রোগীরা।
ডায়রিয়া পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি প্রতিনিধিদল বরগুনায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। মার্চ মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় মাসব্যপি আইইডিসিআরের ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দলটি বরগুনায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করে। দলটি জেলার সবচেয়ে বেশি ডায়রিয়া আক্রান্ত এলাকা ঘুরে রোগীদের মল, বিভিন্ন উৎসের পানির নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়েছে।

আইইডিসিআরের তিনজন রোগতত্ত্ববিদ (চিকিৎসক) ও তিনজন কারিগরি সহায়ক এই দলে আছেন। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন রোগতত্ত্ববিদ জাহিদুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতি বছর এই মৌসুমে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। কিন্তু এবার আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি। মূলত এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য আমরা বরগুনায় গবেষণা করছি। এ জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ, আক্রান্ত ব্যক্তি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলছি। একই সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছি।

প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বোঝা গেছে- এ অঞ্চলের মানুষের একটি নেতিবাচক প্রবণতা হলো দৈনন্দিন কাজে খালের পানি ব্যবহার করা। বিশেষ করে সকালে ভাতের সঙ্গে খালের পানি মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাস আছে। এই অভ্যাস বদলাতে হবে। গৃহস্থালিসহ সব কাজে নলকূপের পানি ব্যবহার করতে হবে।

বরগুনা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আইইডিসিআরের অপর একটি প্রতিনিধিদল ১ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত বরগুনার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের তালিকা ধরে সমীক্ষা চালায়। এতে ৯৪ শতাংশ লোক গভীর নলকূপের পানি পান করলেও ৭১ শতাংশ মানুষ দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজে খালের পানি ব্যবহার করে। সমীক্ষাভুক্ত এলাকায় মাত্র ২০ শতাংশ বাড়িতে গভীর নলকূপ আছে। প্রতিষ্ঠানটি বরগুনার খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবে পরীক্ষা করে খালের পানিতে মলের জীবাণুর উপস্থিতি পেয়েছে। ২০ জন রোগীর মল পরীক্ষায় তিনজনের মলে কলেরা ও ইকোলাই জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এর মধ্যে খাওয়া ও গৃহস্থালির কাজে নিরাপদ পানি ব্যবহার নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে গভীর নলকূপের সংখ্যা বাড়ানো, খাল–নদীর পানি ফুটিয়ে অথবা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে পানি নিরাপদ করে ব্যবহার করা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া।

আইইডিসিআরের প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে সিভিল সার্জন মারিয়া হাসান বলেন, আমরা এরই মধ্যে সুপারিশমালা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়েছি।জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, বৃহষ্পতিবার পর্যন্ত ডায়রিয়ায় বরগুনার বেতাগী উপজেলার দুই, বরগুনা সদর ও আমতলী উপজেলার দু’জন মারা গেছেন। এ ছাড়া ৮ থেকে ২০ এপ্রিলের বরগুনার বেতাগীতে আরো চারজন বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। হাসপাতালে ও বাড়িতে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। এ জন্য জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে।

এক যুগের মধ্যে এ বছর বরগুনায় ডায়রিয়ার প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বরগুনার সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত বরগুনা জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ১৭০ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন আটজন।