এম.এ.আর.নয়ন: নিরাপদ ও আরামদায়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যম হিসেবে রেলকেই সারাবিশ্বের মানুষ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। বাংলাদেশের মানুষও এর ব্যতিক্রম নই। তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াত এবং সড়ক পথের ভোগান্তি এড়াতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ট্রেন ভ্রমণকেই সর্বোত্তম মনে করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও রেলের কালো বিড়াল বের করে আনতে কেউই সক্ষম হননি, জড়িয়ে গেছেন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে। কিন্তু এর থেকে বের হয়ে আসার সত্যিই কি কোন উপায় নাই? বাংলাদেশ রেলওেয়ের অব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে ৬ দফা দাবিতে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে সম্প্রতি অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন হাওলাদার ওরফে রনি। পরবর্তীতে তার সাথে যোগদেন আরও অনেকেই। গত মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি রেলওয়ের মহাপরিচালকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন। এর আগে তিনি টিকেট ক্রয়ে অনিয়ম ও ভোগান্তির শিকার হয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। তার অভিযোগ আমলে নিয়ে শুনানি শেষে বুধবার রেলের টিকেট বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমকে ২ লক্ষ টাকা জরিমানা করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। যদিও এই রায়ে সন্তুষ্ট নই সহজ ডটকম। তারা এর বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে সহজ ডটকমের বিরুদ্ধে আগে থেকেই নানা অভিযোগ রয়েছে। এ সমস্ত বিষয়ে বিভিন্ন সময় অনিয়মের অভিযোগ এনে যাত্রীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করলেও রনির মতো করে সরাসরি কেউ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেননি। বুধবার সকালে টিকেট না পেয়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশনে আটকে রাখেন শিক্ষার্থীরা। লাইনে দাঁড়িয়েও টিকেট না পেয়ে তারা আন্দোলন শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও টিকেট দেওয়া শুরুর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আর টিকেট নাই বলে কাউন্টার থেকে জানানো হয়। তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার্থী। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ট্রেনটি আটকে রাখায় ট্রেনের যাত্রীরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েন এবং নারায়ণগঞ্জ ছাড়া ঢাকার সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা রেলওয়ের অব্যস্থাপনা পরিবর্তনে ঢাবি শিক্ষার্থী রনির আন্দোলনকে যৌক্তিক বলে মনে করেন এবং তার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা পর কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে তারা অবরোধ তুলে নেন এবং টিকেট হাতে পেয়ে তারপর স্টেশন ত্যাগ করেন। এক রনির আন্দোলনেই ভীত হয়ে পড়েছেন রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রথম দিকে একা একা অবস্থান কর্মসূচি পালন করলেও পরবর্তীতে তার সাথে যোগদেন তার সহপাঠীরা। রনির সাথে দেখা করে রেলওয়ের অব্যস্থাপনা পরিবর্তনের জোর দাবি জানান বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী। তবে আন্দোলন করার কারণে বিভিন্নভাবে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রনি। রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে ৬ দফা দাবিতে গত ৭ জুলাই থেকে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসলেও তার দাবি মেনে নিয়ে সমস্যার সমাধান করা হবে এমন আশ্বাস তিনি রেল কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে পাননি। যে কারণে এখনও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন৷ রনির ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হওয়ায় বৃহস্পতিবার তিনি পুনরায় কমলাপুর রেলস্টেশনে প্রবেশ করতে গেলে তাকে বাধা প্রদান করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বৃহস্পতিবার রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে উপস্থিত হয়ে রনির সাথে দেখা করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। এ সময় তিনি রনির ৬ দফা দাবিকে সমর্থন করেন এবং রেলওয়ের অব্যবস্থপনা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এদিকে রনির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে গত কয়েকদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার খবর পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ রেলওেয়ের হ য ব র ল অবস্থা। নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়ম, অবকাঠামো উন্নয়নে নজর না দেওয়া, ত্রুটিপূর্ণ রেললাইন মেরামতে গড়িমসি, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, টিকেট কালোবাজারি, তেল চুরি করে বিক্রি করা, যাত্রী সাধারণের সাথে খারাপ আচরণ, টাকার বিনিময়ে বিনা টিকেট রেলভ্রমনে সহায়তা করাসহ নানা ধরনের কাজ করে থাকেন রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আর ঈদ আসলে যেন অনিয়ম আরও বেড়ে যায়। কাউন্টারে টিকেট না পেলেও স্টেশনের প্লাটফর্মের উপর থাকা চায়ের দোকানগুলোতে পাওয়া যায় টিকেট৷ যা সংগ্রহ করতে যাত্রীদের গুণতে হয় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি টাকা। সরকার রেলের উন্নয়ের জন্য প্রতিনয়ত কাজ করে গেলেও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে তা একেবারে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। রেলের সকল দুর্নীতি দূর করে রেলকে আধুনিক করা গেলে এটি অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সেইসাথে বৃদ্ধি পাবে সরকারের সুনাম এমনটাই মনে করেন রেলভ্রমণকারীরা। কারণ পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে রেল সেবার মান অনেক ভালো। তাদের দেশের জনগণ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যম হিসেবে রেলকেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকেন। অচিরেই বাংলাদেশ রেলওয়ের সকল প্রকার দুর্নীতি দূর হবে বলে মনে করেন দেশের সাধারণ জনগণ। আর এ জন্য প্রয়োজন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতা।