এ আল মামুন, বিনোদন ডেস্কঃ

বিনোদনপিপাসু দর্শকদের কাছে দেশীয় নাটক ব্যাপক সমাদৃত হওয়ার ফলে নাটকের নির্মাণ বৃদ্ধি পেয়েছে আশাতীত হারে। লগ্নিকৃত টাকা তুলে এনে মুনাফার মুখ দেখা যায় বলে নাটক বর্তমানে শিল্পের রূপ ধারণ করেছে। এতে করে এই শিল্পের উপর নির্ভর করেই জীবনের তরী বেয়ে চলেছেন অগণিত মানুষ। কিন্তু শিল্পীর সাইনবোর্ডে কতিপয় স্বেচ্ছাচারির অপেশাদার আচরণ, ড্যামকেয়ার ভাব ও বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে জিম্মি হয়ে পড়েছে নির্মাতা ও প্রযোজকরা আর হুমকির মুখে লাভজনক এই শিল্প। নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি করে দিনের পর দিন নির্মাতাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন বলে নাটক নির্মাণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন বেশিরভাগ নির্মাতা।

 

আর সিন্ডিকেটের অপেশাদার আচরণ ও তাদের স্বেচ্ছাচারিতায় সাড়া দিতে না পেরে নাটক নির্মাণ থেকে সরে এসেছেন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন নির্মাতারা। নির্মাতাদের জিম্মি করে অযৌক্তিক পারিশ্রমিক আদায় ও তাদের পছন্দের সহশিল্পীকে কাস্টিং দিতে নির্মাতাদের বাধ্য করছেন নাটক পাড়ায় নির্মিত শিল্পী নামধারীদের অশিল্পীসুলভ সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের কবলে হুমকির মুখে নাট্যশিল্প এমন অভিযোগ নাটকপাড়ার মানুষের মাঝে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম দিনে দিনে বৃদ্ধি পেলেও শিডিউল হারানোর ভয়ে মুখ খুলছেন না জিম্মি নির্মাতারা। যার ফলে রকেটের গতিতে বেড়েই চলছে এসব সিন্ডিকেটের আধিপত্য। এ জন্য সম্ভাবনাময় অনেকের ক্যারিয়ারই ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিষয়টি নাটকের নির্মাতাদের কাছে বিষফোঁড়ার আকার ধারণ করলেও একটা শিডিউল পাওয়ার আশায় মুখ বুঁজেই শিল্পী নামধারী অশিল্পীদের আচরণ সহ্য করে যাচ্ছেন অসহায় নির্মাতারা। সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সিনিয়র অভিনয় শিল্পীরাও এ নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন। আবার কেউ কেউ পুরো বিষয়টিকেই মিডিয়ার সৃষ্টি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদ বা বিশেষ দিবসের আগে সিন্ডিকেট মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এ সময় চাহিদা সম্পন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নির্দিষ্ট পরিচালক ও সহশিল্পীর বাইরে গিয়ে কাজ করেন না। এমনকি কাজের প্রস্তাব দিলেও, সিন্ডিকেটের বাইরের পরিচালকদের সিডিউল নেই বলে ফিরিয়ে দেন। ফলে বছর জুড়ে একসময় টিভি পর্দায় দেখা যেত আফরান নিশো, মেহজাবীন চৌধুরী, তানজিন তিশা, জিয়াউল হক অপূর্ব, তৌসিফ মাহবুব, সাফা কবির প্রমুখকে। তবে নতুন করে সিন্ডিকেট চর্চায় আলোচনায় সরব নিলয় আলমগীর, জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি, শামীম হাসান সরকার, অহনা, আরশ খান, তানিয়া বৃষ্টি, মিশু সাব্বির, যাহের আলভী, ইফফাত আরা তিথি, প্রভা প্রমুখ।

অভিযোগ রয়েছে, নিলয়, শামীম, আরশ ও আলভীরা নিজেদের পছন্দের নির্মাতা ও শিল্পীদের বাইরে কাজ করেন না। তাছাড়া প্রতিটি কাজে সহশিল্পী হিসেবে নিজেদের পছন্দের শিল্পী ও ক্যামেরাম্যানকে কাজে নেওয়ার কথা বলেন। এর মধ্যে ওইসব অভিনেতার পছন্দের তালিকায় রয়েছে তাদের গার্লফ্রেন্ড অভিনেত্রীরাও।

তাদের নিলেই মিলে সিডিউল। অন্যথায় মাসের পর মাস ঘুরে তাদের সিডিউল পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ। যদিও এর বাইরে কাজ করেন সে ক্ষেত্রে দিগুণ পারিশ্রামিক নেন বলে অভিযোগ। তবে এ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। যার কারণে অভিযুক্ত ওইসব শিল্পীরাও বিষয়টি ঠিক নয় দাবি করে আপন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত বেশিরভাগ নাটকে ঘুরেফিরে একই মুখ দেখতে দেখতে দর্শকও ক্লান্ত। কার্যতই দিনকে দিন টিভি নাটক তার বৈচিত্র্য হারাচ্ছে। এতে করে তাদের সমসাময়িক অনেক তারকারই কাজ কমে গেছে। ভিউয়ের দৌড়ে বেশকিছু অভিনয়শিল্পী ভালো কাজ করলেও ভালো নির্মাতা ও সহশিল্পীর কারণে তারা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। আবার অনেকে অকালে ঝরে যাচ্ছেন।

নাটক এখন সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে জানিয়ে প্রখ্যাত অভিনেত্রী ডলি জহুর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আগের মতো এখন আর মানসম্মত নাটক নির্মাণ হয় না। তা ছাড়া নাটকে চরিত্র কমে গেছে। আমাদের মতো সিনিয়রদের কথা চিন্তা করে কোনো চরিত্রও রচিত হয় না। এখন তো এক জোড়া নায়ক-নায়িকা থাকলেই নাটক হয়ে যায়, ফলে দর্শক মন ভরাতে পারছে না এসব নাটক। এটা যেন একটা ট্রেন্ড চালু হয়ে গেছে। পারিবারিক গল্প বলতে গেলে এখনকার নাটকে প্রায় উপেক্ষিত। আগে বিটিভিতে কত সুন্দর নাটক হতো। নাটক নাকি এখন সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে। তাই দর্শকের চাহিদা বরাবরই উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টেলিপ্যাব)-এর এক প্রযোজক নেতা ও পরিচালক বলেন, বর্তমানে বেশ কয়েকজন শিল্পীদের কাছে নির্মাতারা জিম্মি। ওইসব শিল্পীরা নির্দিষ্ট ঘরানার বাইরে কাজ করে না। অনেকে তো ফোনই ধরে না। ফোন দিতে দিতে ফোন ধরলেও ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে কথা বলবে জানিয়ে রেখে দেয়। পরে আর তাদের খবর থাকে না। গল্প পাঠাতে বলে নানা রকম তালবাহনা করে। অথচ অনেক বড় মাপের শিল্পীদের ফোনে পাওয়া গেলেও গল্প না দেখেই সিডিউলে নেই জানান সিন্ডিকেটের ওইসব শিল্পীরা। আবার এও বলে থাকেন যে, অমুকের সঙ্গে কাজ করিনি তার সঙ্গে কাজ করতে চাই না। নানান রকমের কথা। এ সময়ের বেশ কয়েকজন শিল্পীদের কারণে পুরো ইন্ডাস্ট্রির বদনাম হচ্ছে।

এক সাক্ষাৎকারে হাজির হয়ে ছোট ও বড় পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেছিলেন, টেলিভিশন নাটকে এক ধরনের বাজে সিন্ডিকেট রয়েছে। তার পরপরই একই দাবি করেন অভিনেত্রী ফারিয়া শাহরিন। তার দাবি, এই সিন্ডিকেটে কিছু জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা রয়েছেন, যারা নির্দিষ্ট কয়েকজনের বিপরীতে ছাড়া কাজ করেন না।

অর্থাৎ ফারিয়া শাহরিন বোঝাতে চেয়েছেন, নাটকের ওই সকল নায়ক-নায়িকা নিজেই ঠিক করেন তাদের বিপরীতে কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রী কাজ করবেন। যাতে তাদের অভিনীত নাটক হিট হয়। সিন্ডিকেটের বাইরে তারা কারও সঙ্গে অভিনয় করতে চান না। ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে এই বিষয়গুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন ফারিয়া শাহরিন।

অভিনেত্রী তারিন জাহান বলেন, এখন মিডিয়ায় সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। সিন্ডিকেটের কারণেই মিডিয়ায় ধস নেমেছে। নাটক প্রচার হচ্ছে, অসংখ্য নাটকও তৈরি হচ্ছে- কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে নাটকের অবস্থা ভালো না। সিন্ডিকেট থেকে মিডিয়া মুক্ত না হলে এর অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে। এ সিন্ডিকেট করে কাজ করার কারণে অনেক অভিনয়শিল্পী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত এক বছরে টেলিভিশন কিংবা অনলাইনের জন্য যেসব নাটক নির্মাণ করা হয়েছে, তার বেশিরভাগ কাজেই গুটিকয়েক অভিনয়শিল্পীকে দেখা গেছে।

আগামী ঈদের জন্যও যে নাটকগুলো তৈরি হচ্ছে এগুলোর দিকে তাকালে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শোবিজ সংশ্লিষ্টরা। একখণ্ডের নাটকগুলোয়ই সিন্ডিকেট করে কাজ করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। প্রজন্মের অনেকেই এ ধারা অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ অনেকের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারিত বেশিরভাগ নাটকেই গুটিকয়েক অভিনয়শিল্পীকে দেখা গেছে। আগামী ঈদের জন্যও যে নাটকগুলো তৈরি হচ্ছে এগুলোর দিকে তাকালে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শোবিজ সংশ্লিষ্টরা। একখণ্ডের নাটকগুলোয়ই সিন্ডিকেট করে কাজ করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। প্রজন্মের অনেকেই এ ধারা অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ অনেকের। এ অবস্থা চলতে থাকলে চলচ্চিত্রের মতো নাটকেও ধবস নামার আশংকায় রয়েছেন নাটকপাড়ার মানুষেরা।