বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম ও নিখোঁজের ঘটনাগুলো একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বারবার সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে Mir Ahmad BinQuasem-এর সংসদে উত্থাপিত প্রশ্ন নতুন করে এই আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তার বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসংখ্য প্রশ্নের প্রতিধ্বনি।
গত এক দশকে বেশ কিছু আলোচিত গুমের ঘটনা দেশের মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে। Ilias Ali-এর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়া, Aman Azmi-কে পরিবারের কাছ থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, এবং আরও বহু অজানা-অচেনা মানুষের হঠাৎ অন্তর্ধান—এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের অনেকেরই কোনো সন্ধান আজও মেলেনি। এই সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি অপেক্ষা, এবং এক অনিশ্চিত যন্ত্রণা।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলোর প্রতি সমাজের প্রতিক্রিয়া সবসময় একরকম নয়। কেউ প্রতিবাদ করেন, কেউ নীরব থাকেন, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এসব বিষয়কে উপেক্ষা করেন বা হালকাভাবে দেখেন। এই বিভাজন আমাদের সামাজিক বিবেকের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
একটি সুস্থ সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। গুম বা নিখোঁজের মতো গুরুতর অভিযোগগুলো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।
কারণ, আজ যিনি ভুক্তভোগী—তিনি হয়তো কোনো দলের সদস্য, কিন্তু তার কষ্ট, তার পরিবারের কান্না—সেগুলো কোনো দলের নয়, সেগুলো মানবতার।
সমাজের একটি অংশের প্রতিক্রিয়া আরও বেশি বেদনাদায়ক। যখন দেখি, গুমের মতো সংবেদনশীল ও মানবিক ট্র্যাজেডিকেও কেউ কেউ সমর্থন করে কিংবা তা নিয়ে উপহাস করে, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের বিবেক কি ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে? আমাদের ঈমান-আমল, নৈতিকতা ও মানবিকতা কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে?
গুমের শিকার মানুষগুলো কোনো পরিসংখ্যান নয়—তারা কারো বাবা, কারো সন্তান, কারো প্রিয়জন। তাদের নিয়ে ঠাট্টা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য শুধু একটি মতের প্রকাশ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যকে অস্বীকার করা, অন্যায়ের প্রতি উদাসীন থাকা বা তা নিয়ে উপহাস করা—এসবই একটি সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। পবিত্র কোরআনে এমন মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা সত্য দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না—অর্থাৎ তাদের বিবেক ও অনুভূতি অচল হয়ে পড়ে।
কলাম লেখক- ব্যারিস্টার মিজানুর রহমান খান!