নুরুল্লাহ ভূইয়া, চরফ্যাশন (ভোলা) :
মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে বঙ্গোপসাগর ঘেষা ভোলার সর্বদক্ষিণের উপজেলা চরফ্যাশনের চার থানা(চরফ্যাশন, শশীভূষণ,দুলার হাট ও দক্ষিণ আইচা) এলাকার ২১টি ইউনিয়নে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাতে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, বিভিন্ন সবজি ক্ষেত ও মাছের ঘের। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, কৃষক ও মৎস্যচাষিরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কাঁচা রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও রোগীদের চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে। বসতবাড়ির আঙিনায় পানি জমে পড়ায় ভোগান্তিতে রয়েছেন নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।
কৃষকেরা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আমনের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে মাছের ঘেরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করায় মাছ বেরিয়ে যাওয়ার এবং উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চর মানিকা ইউনিয়নের কৃষক হারুন অর রশিদ বলেন, “টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে আমার আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে শশা, করলা ও কাঁচামরিচের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আরও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।”
চর মাদ্রাজের ইউনিয়নের মৎস্যচাষি মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, “গত সাত বছর ধরে মাছ চাষ করছি। কিন্তু এবারের মতো এমন বিপর্যয়ের মুখে কখনো পড়িনি। টানা ভারী বর্ষণে আমার তিনটি মাছের খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। খামার থেকে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার মাছ ভেসে বেরিয়ে গেছে। এখন কীভাবে ক্ষতি পুষিয়ে উঠব, সেটাই বুঝতে পারছি না। সরকারের সহযোগিতা পেলে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, “টানা ভারী বর্ষণে চরফ্যাশন উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৩৬০ জন মৎস্যচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলার ৩ হাজার ৬৭১টি ছোট-বড় মৎস্য খামার, যার মোট আয়তন প্রায় ২১৮ হেক্টর, পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৭২ মেট্রিক টন মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদের কাজ চলমান রয়েছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা বলেন, “টানা ভারী বর্ষণে চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ হাজার ২১০ হেক্টর শাকসবজির জমি এবং ১৭০ হেক্টর আমনের বীজতলা আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শাকসবজির মধ্যে রয়েছে শশা, করলা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, কাঁচামরিচ, বরবটি, ধুন্দলসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। পানি দ্রুত নেমে গেলে অধিকাংশ ফসল পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, “উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব এলাকায় বৃষ্টির পানি জমেছিল, সেসব স্থানে ধীরে ধীরে পানি নেমে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে টানা বর্ষণে কৃষক ও মৎস্যচাষীরা কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে মূল্যায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করা হবে।”
এদিকে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।