খেলাধুলা:: কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে যখন আর্জেন্টিনা ম্যাচ টাই করে অতিরিক্ত সময়ে গেল এবং পেনাল্টি মিসের খেসারত দিতে গিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর অবশেষে সেমিফাইনালে পা রাখল, তখন মাঠের মাঝেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন লিওনেল মেসি। তবে এই অশ্রু কেবল উল্লাসের ছিল না, এর পেছনে ছিল বুক হালকা করা এক স্বস্তি। এই স্বস্তি সতীর্থদের ভরসা ধরে রাখতে পারার স্বস্তি।
৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর তার জীবনের সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন, যেখানে প্রতি মুহূর্তে আবেগ, পরিবারের চিন্তা, সমর্থকদের বিপুল প্রত্যাশা এবং সতীর্থদের ভালোবাসা তাকে এক দোলাচলের মাঝে রাখছে। তবে এই সব চাপের মাঝেও জীবনের সবচেয়ে সুখী সময় পার করছেন মেসি, কারণ তিনি এখন খেলছেন এমন এক দলে যা সম্পূর্ণ তার মনের মতো করে গড়ে উঠেছে।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি সব সময়ই মাঠের ট্যাকটিকসের চেয়ে খেলোয়াড়দের মধ্যকার আত্মিক বন্ধনকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। স্কালোনির ভাষায়, মাঠে ৪-৩-৩ ফর্মেশনের চেয়েও বন্ধুদের সাথে ‘মেট’ (দক্ষিণ আমেরিকান এক ধরনের চা) খাওয়া, একসঙ্গে বারবিকিউ করা বা তাসের আসরে আড্ডা দেওয়াটাই বেশি আনন্দের। আর কোচের এই ভাবনার মাঝেই নিজের শৈশব ও হারিয়ে যাওয়া তারুণ্যকে খুঁজে পেয়েছেন মেসি। বর্তমান আর্জেন্টিনা দলটির প্রতিটি সদস্য যেন তাদের অধিনায়কের রক্ষাকবচ। বিশেষ করে মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল এখন মেসির সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। প্রতিদিন সকালে ডি পলের ঘরে সবার আগে মেসির চা খাওয়ার মধ্য দিয়ে যে আড্ডার নিয়ম শুরু হয়, তা মাঠের বাইরে পুরো দলকে একটি পরিবারে রূপ দিয়েছে। মাঠে নামার সময় মেসির পাশে ডি পল এবং পেছনে অন্য সতীর্থদের হাঁটার দৃশ্যটি দেখলে মনে হয় যেন কোনো এক গ্যাং বা দল তাদের নেতাকে বুক দিয়ে আগলে রেখে মাঠে প্রবেশ করছে।
এই বয়সে এসেও মেসিকে সেরা ছন্দে রাখতে দলের কোচ ও পুষ্টিবিদরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। বিশেষ ডায়েট আর অনুশীলনের কারণে কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে মেসির গতি এখন প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও ম্যাচের ৪৭ শতাংশ সময়ই মেসি মাঠে হেঁটে বেড়ান এবং পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ৬৩১ মিটার দূরত্ব সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়েছেন, তবু তিনি টুর্নামেন্টের অন্যতম শীর্ষ গোলদাতা। ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পেরই দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোলে সরাসরি অবদান রাখার অনন্য কীর্তি রয়েছে। স্কালোনি মাঠে মেসিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে মেসি যখনই ডান প্রান্ত থেকে সেন্ট্রাল পজিশনে চলে যান, দলের বাকিরা সেই অনুযায়ী নিজেদের পজিশন বদলে নেন। মেসির এই ক্ষুরধার ফুটবল মস্তিষ্কের ওপর দলের সবার এতটাই ভরসা যে, অধিনায়ক যেকোনো সিদ্ধান্ত নিলেই বাকি দল তার সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
আজ রাতে আর্জেন্টিনার ‘চিরশত্রু’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে নামার আগে দলের ভেতরে চলছে এক বাড়তি উন্মাদনা। ড্রেসিংরুমে এখন খেলোয়াড়দের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে নতুন বিশ্বকাপ সংগীত— যেখানে ১৯৮৬ সালের পর ২০২২ সালে মেসির হাত ধরে তৃতীয় তারকা জয়ের পর, এবার মেসির শেষ বিশ্বকাপে চতুর্থ স্টার বা ‘লা কুয়ার্তা এস্ত্রেলা’ জয়ের শপথ নিচ্ছেন সতীর্থরা। মাঠের লড়াইয়ে সতীর্থরা যখন মেসির চোখে পানি দেখেন, তখন তারা তাকে জড়িয়ে ধরে এই বিশ্বাসটাই দেন যে— নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলার আগে তারা মাঠে নিজেদের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়তে প্রস্তুত।
সূত্র: বিবিসি