তালতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:: ‘আমার ছেলের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করাইয়া দেও। তোমাগো হাত-পা ধইরা কই, যোগাযোগ করাইয়া দেও। আমার একটা সন্তান। ও ছোট থাকতে স্বামী হারাইছি। আমার কেউ নেই এই ছেলে ছাড়া। আমাকে “মা” কইয়া ডাকবে, এমন কেউ নেই। মোর মানিকেরে আইনে দেও মোর কোলে! ওরে হানিফা, তোর মায়রে কেউ মা কয় না। তুই কী কইয়া গেলি, আমি তোরে কেমনে ভুইলা থাকমু?’এভাবেই বুকফাটা আহাজারি করে বিলাপ করছিলেন ছাহেরা বেগম। সৌদি আরবে একমাত্র সন্তান হানিফের মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছেন তিনি। সন্তানের মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে এবং নিজ হাতে দাফন করার আকুতি জানিয়ে কাঁদছেন বারবার। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের পরিবেশ।

আজ রোববার সকালে নিজ বাড়িতে বিলাপ করতে করতে এসব কথা বলেন ছাহেরা বেগম। তার একমাত্র সন্তান হানিফ (৩৬) সৌদি আরবে মারা গেছেন। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো জানতে পারেনি পরিবার। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এবং আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

হানিফ একই এলাকার প্রয়াত জালাল মিয়ার ছেলে। মাত্র দুই বছর বয়সে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে বাবাকে হারান তিনি। এরপর মা ছাহেরা বেগমের আশ্রয়েই বেড়ে ওঠেন। হানিফের সংসারে রয়েছে ১১ বছর বয়সী ছেলে মো. জেনায়েদ ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মোসা. ছামিরা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা তার স্ত্রী ও দুই সন্তান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় আড়াই বছর আগে ধারদেনা করে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান হানিফ। ভিসাসংক্রান্ত জটিলতায় প্রায় দুই বছর ধরে অবৈধভাবে একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। পরে ভিসা বৈধ করার আশায় পাঁচ মাস আগে বিভিন্ন এনজিও ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে দালালদের আরও চার লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু তার সেই চেষ্টা আর সফল হয়নি। গত ৩ অক্টোবর সৌদি আরবেই মারা যান হানিফ। ওই দিনই তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

হানিফের মৃত্যুর পর একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা—দুই সংকটে বিপর্যস্ত পরিবারটি। অর্থাভাবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা দ্রুত সরকারি সহায়তায় হানিফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

হানিফের স্ত্রী কাজল আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘স্বামীকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ধারদেনা করে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। পরে ভিসা বৈধ করার আশায় ছয়টি এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরও চার লাখ ৫০ হাজার টাকা দিই। এখন দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর কোনো উপায় নেই। উল্টো মাথার ওপর ঋণের পাহাড়। আমার স্বামী মারা গেছে, এখন আমার সন্তান দুটি কার মুখের দিকে তাকাবে? সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার স্বামীর মরদেহ দেশে এনে দাফনের ব্যবস্থা করে দিন, যেন ছেলে-মেয়ে তাদের বাবার কবর দেখতে পারে। আমি সরকারের কাছে আর কিছু চাই না।’এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। উপজেলা প্রশাসন এ প্রক্রিয়ায় অসহায় পরিবারটিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।’