আপডেট: August 1, 2026
আমি ব্যারিস্টার মিজানুর রহমান খান আমার বাসা থেকে লন্ডনের বিখ্যাত থেমস নদী খুবই কাছে হেঁটে যেতে মাত্র ৫ মিনিট সময় লাগে, মাঝে মাঝে আমি সেখানে হেঁটে যাই কিছুক্ষণ নদীর পাশে বসে সময় কাটাতে আজও বাসা থেকে হেঁটে লন্ডনের বিখ্যাত থেমস নদীর তীরে গিয়ে ছিলাম। নদীর শান্ত স্রোত, চারপাশের নীরবতা আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য মানুষকে নিজের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে যখন নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন অজান্তেই দেশের কথা মনে পড়ে, মানুষের কথা মনে পড়ে, আমাদের সমাজ ও রাজনীতির বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে। আজও ঠিক তেমনই ভাবছিলাম বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৫ বছরে পরেও আমরা কি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও বিবেকবান সমাজ গড়তে পেরেছি?
বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং অসংখ্য মানুষের ত্যাগের পরও কি আমরা কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছি? এত রক্ত, এত কান্না, এত আত্মত্যাগ—এসব কি শুধুই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আমাদের চিন্তা-চেতনা ও আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটবে?
সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে ভাবায়, তা হলো—আমরা কেন এখনও সত্যকে সত্য বলতে এত ভয় পাই? কেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই প্রথম প্রশ্ন হয়ে যায়, “আপনি কোন দলের?” কেন একজন মানুষের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার আগে তাকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের খাঁচায় বন্দি করার চেষ্টা করা হয়?
আজ যেন আমাদের সমাজে যুক্তির চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে গেছে, সত্যের চেয়ে দল বড় হয়ে গেছে, আর ন্যায়ের চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে। কেউ যদি নিজের বিবেকের তাড়নায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোনো না কোনো রাজনৈতিক তকমা দিয়ে তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়। অথচ সত্য কখনো কোনো দল বা মতাদর্শের একচেটিয়া সম্পদ নয়। সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতা সব মানুষের জন্য সমান।
আমরা যদি প্রতিটি অন্যায়কে দলীয় চশমা দিয়ে দেখি, তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কখনো সম্ভব হবে না। নিজের দলের অন্যায়কে নীরবে সমর্থন করা এবং প্রতিপক্ষের অন্যায়কে শুধু রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা—এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে আরও বিভক্ত করছে।
আমার বিশ্বাস, একটি জাতির শক্তি তার অর্থনীতি বা অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার মানুষের বিবেক, নৈতিকতা এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসের মধ্যেই সেই শক্তির প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে। আমরা যদি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন সমাজ রেখে যাচ্ছি?
আমি কোনো ব্যক্তি বা দলের অন্ধ সমর্থক হতে চাই না। আমি শুধু এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে অন্যায় করলে সে যে-ই হোক, তার সমালোচনা হবে; আর ভালো কাজ করলে দল-পরিচয় না দেখে তার প্রশংসা করা হবে। যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু ভিন্নমতকে শত্রু মনে করা হবে না। যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।থেমস নদীর শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে আজ আমার মনে শুধু একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল!
আমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চাই, নাকি শুধু ক্ষমতার পালাবদল চাই?
যেদিন আমরা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সত্য, অন্যায়কে অন্যায় এবং ন্যায়কে ন্যায় বলতে শিখব, সেদিনই হয়তো একটি সত্যিকারের মানবিক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের পথে আমরা এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারব। হয়তো সেই দিনের অপেক্ষাতেই আমরা সবাই আছি।
লেখক- ব্যারিস্টার মিজানুর রহমান খান!
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, শিক্ষা ও ক্রীড়ানুরাগী,মিডিয়া ব্যক্তিত্ব লন্ডন প্রবাসী বরিশাল বাণী’র উপ-সম্পাদক!
মিজান খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ চেয়ারম্যান!

