আপডেট: December 23, 2021
অনলাইন ডেস্ক:: কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. জুয়েল রানা। জেলার দাউদকান্দি ও চান্দিনা সার্কেলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। চতুর্থ ধাপে আগামী ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটি ইউনিয়েনে আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। ওই তিনটি ইউনিয়ন হলো- কালিকাপুর, উজিরপুর ও কাশিনগর।
সম্প্রতি কালিকাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ভোটারদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভায় যোগ দেন তিনি। সেখানে নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। ওই বক্তব্যের এক অংশে নির্বাচন সুষ্ঠু করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জুয়েল রানা উপস্থিত প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন- ‘নৌকার প্রার্থী হয়েছেন বলে চেয়ারম্যান হবেন সেটা ভুলে যান, ব্যালট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলেই ডাইরেক্ট গুলি চলবে!’
ওই সভায় মো. জুয়েল রানার দেওয়া ১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাহসী বক্তব্যের জন্য প্রসংশায় ভাসতে থাকেন তিনি। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই হঠাৎ পুলিশ দপ্তর থেকে তাঁকে বদলি করা হয়েছে।
গত রবিবার (১৯ ডিসেম্বর) পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১) কাজী জিয়া উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জুয়েল রানাকে সিলেটে সপ্তম আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) বদলি করা হয়। এরই মধ্যে তাঁর ওই বদলির চিঠিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এনিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন- ‘একজন সৎ ও সাহসী পুলিশ কর্মকর্তাকে সততার জন্য বদলি করা হলো’।
ভাইরাল হওয়া ১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে সিনিয়র এএসপি মো. জুয়েল রানা বলেন, নৌকার প্রার্থী হয়েছেন বলেই চেয়ারম্যান হয়ে যাবেন বিষয়টা এমন না। আমি যেখানে নির্বাচন করেছি সেখানে নৌকা ২৫১ ভোট পেয়েছে। চেয়ারম্যান হয়েছে ৩ হাজার ভোটে, সেকেন্ড হয়েছে ২ হাজার ৮০০ ভোটে, থার্ড হয়েছে ২ হাজার ৭০০ ভোটে আর নৌকার প্রার্থী ৪ নম্বর হয়েছেন ২৫১ ভোটে। এরপরও নৌকার প্রার্থী বলতে পারেননি যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। আরেক ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছে ৭৯০ ভোটে, চেয়ারম্যান হয়েছে ৪ হাজার ভোটে। তারা জামানত হারিয়েছে তারপরও বলতে পারেনি ভোট সুষ্ঠু হয়নি। দাউদকান্দিতে নির্বাচন করেছি- সেখানে এমপি সাহেবের ভাতিজা নৌকার প্রার্থী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান, কিন্তু তিনি হেরে গেছেন। সাধারণ একজন প্রার্থী চেয়ারম্যান হয়েছে। নৌকা নিয়ে আসলেই, টাকা থাকলেই এবং বড় বড় নেতার আত্মীয় হলেই নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া যায় না, এটা তার অনেক বড় প্রমাণ। পুলিশ শুধু প্রতিশ্রুতি দেয় না, প্রতিশ্রুতি রক্ষাও করে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক মহোদয়েরও একই কথা, ব্যালটে হাত দেবেন তো গুলি করব। আমাদের প্রশিক্ষণ আছে, অর্ডার আছে এরপর কেউ কেন্দ্র দখল করতে আসলে আমরা কী ‘ফিডো’ খাব? গুলি করব, এতে যদি কারো হাত-পা পড়ে যায় আমাদের কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। অস্ত্র চালানোর একটা নিয়ম আছে, আগে অনুরোধ করব- না শুনলে গুলি করব। নির্বাচনের দিন আমি কালিকাপুর, উজিরপুর ও কাশিনগর এই তিনটি ইউনিয়েনের সরাসরি দায়িত্বে থাকব। আমি কথা দিচ্ছি এই তিনটি ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকালে কুমিল্লা থেকে কোনো মন্ত্রীও যদি আমাকে ফোন করে আমি কারো কথা শুনব না বরং কথা রেকর্ড করে আমি ছেড়ে দেব।
জুয়েল রানা প্রার্থীদের উদ্দেশে আরো বলেন, সুতরাং এমপি, মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ, প্রধানমন্ত্রী কারো দোহাই দিয়ে আপনারা নির্বাচিত হতে পারবেন না। আমরা মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। মানুষ যদি একজন রিকশাচালককেও নির্বাচিত করে সেই হবে ওই ইউনিয়েনের আগামী পাঁচ বছরের অভিভাবক। ইনশাল্লাহ জনগণের ভোটের অধিকার আমরা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই। এটা শুধু আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব না, এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্বও। এছাড়া নির্বাচনের ভোট সুষ্ঠু করা নিয়ে আরো বিভিন্ন কথা বলেন তিনি।
জুয়েল রানার বদলিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে রিয়াজ হোসেন নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন- ‘একজন সৎ এবং সাহসী পুলিশ অফিসার সততার জন্য আজ বদলি হলো। সঠিক কথা বললে সঠিক পথে চললে পদে পদে লাঞ্ছিত হতে হবে এই সোনার বাংলাদেশ এটাই তার প্রমাণ। কারণ হাজারো খারাপ মানুষের ভিড়ে দুই/একজন ভালো মানুষ টিকে থাকাই খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। শুভ কামনা থাকবে এই পুলিশ অফিসারের জন্য।’
জেলার চান্দিনা উপজেলার বাসিন্দা আবদুল বাতেন মুন্সি, দাউদকান্দির বাসিন্দা মহিউদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন বলেন, সিনিয়র এএসপি জুয়েল রানা একজন জনবান্ধব পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর কাছে গিয়ে কোনো মানুষ সেবা না পেয়ে ফিরে আসেনি। তিনি যোগদানের পর থেকে এলাকায় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তিনি দাউদকান্দিতে সুষ্ঠু ইউপি নির্বাচন উপহার দিয়েছেন। পঞ্চম ধাপে চান্দিনায় ইউপি নির্বাচন হবে ৫ জানুয়ারি। তাঁর এমন বদলিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ভোটাররা এখন সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। এছাড়া বদলির ঘটনায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার দুপুরে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. জুয়েল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, বদলির আদেশ পেয়ে ২০ ডিসেম্বর দাউদকান্দি ও চান্দিনা সার্কেলের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি। আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে সিলেটে এপিবিএনে যোগদান করব। এছাড়া আমি এই বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি না।
ভাইরাল হওয়া বক্তব্যের কারণে মো. জুয়েল রানাকে বদলি করা হয়েছে কি-না, জানতে চাইলে জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মঞ্জুর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে এইটুকু জেনেছি। তবে কেন তাকে বদলি করা হয়েছে, সেটা বলতে পারব না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।

