১৮ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার

আমতলীতে অবৈধ ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ, ফসলি জমির ক্ষতি

আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০২২

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

বরগুনা প্রতিনিধি:: সরকারের ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই বরগুনার আমতলীতে চলতে বেশ কয়েকটি ইটভাটা। এ সকল ইটভাটায় ড্রাম চিমনির মাধ্যমে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। নষ্ট করা হচ্ছে ফসলি জমি আর উজার করা হচ্ছে বন।

বরগুনা জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্র থেকে জানা যায়, জেলায় বৈধ ইটভাটার সংখ্যা রয়েছে ৪২টি। এরমধ্যে আমতলী উপজেলায় ৮টি ড্রাম চিমনির ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটা মালিকরা জানায়, ড্রাম চিমনি ইট ভাটার বৈধতা না থাকলেও এতে পরিবেশ ও ফসলি জমির কোনো ক্ষতি সাধিত হয় না। স্থানীয়দের অভিযোগ বছরের পর বছর এ সকল অবৈধ ড্রাম চিমনির ইটভাটায় পরিবেশ ও ফসলি জমির ক্ষতি হলেও এগুলো বন্ধে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

সরেজমিনে আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের তালুকদার বাজার এলাকায় এইচআরটি নামক একটি ড্রাম চিমনির ইটভাটা কাঠ পুড়িয়ে চালানো হচ্ছে। ওই ইটভাটার পূর্ব পাশেই বড় একটি পুরানো বাজার ও উত্তর পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি দাখিল মাদরাসা রয়েছে। কুকুয়া ইউনিয়নের রায়বালা গ্রামে ৮০০ শতাংশ ফসলি জমির মধ্যে গড়ে উঠেছে আল্লাহর দান নামে একটি ড্রাম চিমনি ইটভাটা। অভিযোগ রয়েছে ওই ভাটার মালিক স্থাণীয় অসহায় গরীব ও নিরীহ মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করে ওই ইটভাটা গড়ে তুলেছেন। একই এলাকায় অবস্থিত এমএমবি নামে আরো একটি ড্রাম চিমনি ইটভাটার চারদিকে ফসলি জমি রয়েছে। এ ছাড়া হাজার টাকা বাঁধ এলাকায় ফাইভ স্টার, কুকুয়া কুতুবপুর এলাকায় আরএনকেএস, চাওড়া মোস্তফাপুর এলাকায় এমএসবি, মহিষডাঙ্গা এলাকায় এমসিকে ব্রিকস নামে ড্রাম চিমনির ইটভাটায় গত বছরের ন্যায় এ বছরও কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো শুরু হয়েছে।

অথচ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে হাইব্রিট হফম্যান, জিগজ্যাগ, ভার্টিক্যাল শ্যাফট কিলন অথবা পরিক্ষিত পরিবেশবান্ধব ইটভাটা করার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকলেও এসব নীতিমালা কোনোভাবেই মানছেন না ওই ড্রাম চিমনি ইটভাটার মালিকরা।

ড্রাম চিমনি ইটভাটার মালিক সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি ইটভাটায় প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৪০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। এতে একেকটি ইটভাটায় মাসে ২৪ হাজার মণ কাঠের প্রয়োজন হয়। সে হিসাব অনুযায়ী আমতলী উপজেলার ৮টি বাংলা ড্রাম চিমনি ইটভাটায় মাসে ১ লক্ষ ৯২ হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হয়। এতে যেমন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে তেমনি উজার করা হচ্ছে বন।

ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রায়বালা গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের জমি জোরপূর্বক দখল করে আল্লাহর দান নামে ওই ড্রাম চিমনি ইটভাটা করা হয়েছে। ওই ভাটার কাঠ ও টায়ার পোড়ানোর ধোঁয়ায় আমাদের বাড়ীতে বসবাস করতে পারছি না।

একাধিক ড্রাম চিমনি ইটভাটার মালিকরা দাবি করেন, কাঠ পুড়ে ইট তৈরিতে ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত ও পরিবেশের উপড় তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছেনা। বিনা অনুমতিতে কিভাবে ভাটা চালাচ্ছেন এর উত্তরে মুচকি হাসি দিয়ে তারা বলেন, বুঝেত তো সবই। এই ভাটার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই। তাই প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে ম্যানেজ করেই আমরা ড্রাম চিমনির ইটভাটা পরিচালনা করছি। তবে আগামী বছর তারা অনুমতি না নিয়ে আর ভাটা চালাবেন না বলে জানায়।

অপর একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রতিটি ড্রাম চিমনি ইটভাটায় প্রতি সিজনে ১৫ থেকে ১৭ লক্ষ ইট পোড়ানো হয়। প্রতিটি ভাটায় ১ লক্ষ ইট তৈরিতে ১০ থেকে ১২ হাজার মাটির প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে উপজেলার ৮টি ড্রাম চিমনি ইটভাটায় প্রতিটিতে প্রতি লক্ষ ইট তৈরিতে ৮০ থেকে ৯৬ লক্ষ মাটির প্রয়োজন হয়। এসব মাটির অধিকাংশ ফসলি জমিতে পুকুর কেটে ও ধানি জমির টপ সয়েল কেটে আনা হয়। তাই দিন দিন ফসলী জমিও কমে যাচ্ছে।

চাওড়া ইউনিয়নের বিশিষ্ট সমাজসেবক ও উপজেলা আওয়ামী লীগ দপ্তর সম্পাদক আলহাজ্ব মো. আনোয়ার হোসেন ফকির বলেন, যেভাবে বৈধ অবৈধ ইটভাটায় ফসলি জমি থেকে মাটি কেঁটে নেয়া হচ্ছে। এতে আগামী ১০ বছরে চাষকৃত ফসলি জমি কমে অর্ধেকে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল কার্যালয়ের পরিচালক মো. হালিম মিয়া মুঠোফোনে বলেন, আমতলী উপজেলায় ৮টি ড্রাম চিমনির ইটভাটায় কাঠ পুড়ে, পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো অবস্থাতেই ওই ভাটা চালাতে দেওয়া হবে না। যদি কোনো ভাটা মালিক চালায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরগুনা জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, যে সকল ইটভাটা পরিচালনার কোনো বৈধ অনুমতি নেই তাদের ভাটা চালাতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে ওই সকল অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জেল জরিমানা করে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
Website Design and Developed By Engineer BD Network