আপডেট: এপ্রিল ২৫, ২০২৬
আমিনুর রহমান নয়ন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গার জেলার জীবননগর ও দর্শনা থানা এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য এবং তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ড। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলেই ঘটছে হামলার ঘটনা। শিকার হতে হচ্ছে নানাধরনের হয়রানির। মাদক কারবারিরা এখন এতটাই বেপরোয়া যে তারা সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করতেও দ্বিধা করছে না।
শহর থেকে শুরু করে গ্রাম-মহল্লার অলিগলিতে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা ও নেশাজাতীয় সিরাপসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য। যা সেবন করে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে যুবসমাজ। তবে পুলিশ, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করলেও মাদক পাচারের মাস্টারমাইন্ডরা বরাবরের মতোই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর যারা আটক হচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই বহনকারী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক কারবারিদের সিন্ডিকেট অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক ব্যাবসা পরিচালনার কথা বলা হলেও এদের মূলত কোনো দল নাই। সব দলের লোকজন মিলেই তৈরি হয় মাদক পাচার সিন্ডিকেট। তবে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সে দলের গুটিকয়েক নেতাদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়। মাদক পাচারকাজে জড়িত বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বললে তারা জানান, অতীতে এ লাইনে থাকলেও এখন আর নাই। তারপরেও আমাদের নাম থেকে গন্ধ যাচ্ছে না। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যারা নিজেদেরকে মাদক পাচার থেকে গুটিয়ে নেওয়ার দাবি করছেন তারাও পুরো দমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আর মাদক কারবারিদের নামের কথা বলতে গেলে তাদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। যারা অতীতে বড় সিন্ডিকেট চালাতেন তারা সবাই এখন মোটামুটি আবারও সক্রিয়। যা স্ব স্ব এলাকার বাসিন্দারা পুরোপুরি অবগত থাকলেও দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকছে না। ক্যামেরার সামনে কেউ রাজি হচ্ছে না কথা বলতে। সমাজের বিবেকবান মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করা ছাড়া একা একা কিছুই করা যাবে না। একা প্রতিবাদ করলে ঘটছে হামলার ঘটনা।
এদিকে মাদক বিক্রির প্রতিবাদ করায় গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে সংঘবদ্ধ দৃর্বৃত্তরা জীবননগর পৌর এলাকার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা কীটনাশক ব্যবসায়ী সেলিম রেজার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। সেলিম রেজা অভিযোগ করে বলেন, এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিক্রি করছেন। তাদেরকে বারবার নিষেধ করলেও তারা কোনো কর্ণপাত করেনি। সর্বশেষ গত বুধবার বিকেলে পুনরায় নিষেধ করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এরই জের ধরে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গভীর রাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে তারা আমার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে।
এছাড়া শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মাদক কারবারিদের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে দর্শনা প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢুকে এক সাংবাদিককে মারধর ও মোবাইল ফোন ভাঙচুর করার অভিযোগ উঠেছে। প্রেসক্লাব সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে আজিমপুর গ্রামের আতর আলীর ছেলে চঞ্চলের নেতৃত্বে কয়েকজন চিহ্নিত মাদক কারবারি মদ্যপ অবস্থায় দর্শনা প্রেসক্লাবের আশপাশে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে তারা প্রকাশ্যে অশালীন আচরণ করে এবং প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এ সময় প্রেসক্লাবের অফিস সহকারী আব্বাস আলী বিষয়টি দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হান্নানকে জানালে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয় এবং মাথায় আঘাত করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে হান্নান প্রাণ বাঁচাতে প্রেসক্লাবের ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও রক্ষা হয়নি। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই চঞ্চলের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল জোরপূর্বক প্রেসক্লাবে প্রবেশ করে। অভিযোগ রয়েছে, তারা পরিকল্পিতভাবে লাইট বন্ধ করে দেয় এবং অন্ধকারের মধ্যে সাংবাদিক আব্দুল হান্নানের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায়। এ সময় তার ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন ভাঙচুর করা হয়। এসব বিষয় এটাই প্রমাণ করে মাদক কারবারিরা এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সক্রিয়। তাদের কার্যক্রম রুখে দিতে অবিলম্বে যদি পুরো জেলা জুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এলাকাভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ কোনো বিকল্প নাই।

