সন্তানের গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ দেখারও সুযোগ পাননি হতভাগ্য পিতা

আপডেট: August 15, 2020

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

 

 

সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াল কালরাতে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকের নির্মম বুলেটে শহীদদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সের ছিলেন সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে বর্তমানে মন্ত্রী পদমর্যাদায় থাকা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপির অতি আদরের বড় পুত্র সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত।

সেইদিন ভাগ্যক্রমে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ প্রাণে বেঁচে গেলেও ঘাতকের নির্মম বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে শহীদ হওয়া চার বছরের আদরের সন্তানের মুখটাও শেষবারের মতো দেখার সুযোগ হয়নি তার। সেই কষ্ট এখনও তাড়িয়ে ফেরে হতভাগ্য পিতা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে।

ঘাতকের নির্মম বুলেটে বড় ছেলেসহ বাবা, ভাই, বোনকে হারিয়ে সেইদিনের নির্মম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গুলিবিদ্ধ সহধর্মীণী সাহান আরা বেগমকে নিয়ে টানা ৪৪ বছর শোকদিবস পালন করেছেন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। রাজনৈতিকভাবে নানা চড়াই উৎরাইয়ের সঙ্গী সাহান আরা বেগমকে ছাড়া এবছরই প্রথম শোক দিবস পালন করতে হবে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহকে। কারণ ঘাতকের নির্মম বুলেটবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যাওয়া শহীদ জননী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহান আরা বেগম চলতি বছরের ৭ জুন রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরদিনের জন্য দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। ফলে এবারের শোক দিবস আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর জন্য আরও বিষাদের ছায়া বয়ে এনেছে।

সূত্রমতে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াল কালরাতে ধানম-ি ৩২ নম্বরে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে মিন্টো রোডের ২৭ নম্বরে তার (বঙ্গবন্ধু) বোনজামাতা ও তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতেও হামলা চালায় ঘাতকরা। যেখানে খুনীরা নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার ভাইয়ের ছেলে সাংবাদিক শহিদ সেরনিয়াবাত, কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত এবং বরিশালের ক্রিডেন্স শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য আব্দুর নঈম খান রিন্টুকে।

এ ছাড়া ঘাতকের নির্মম বুলেটে সেদিন আহত হয়েছিলেন-আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের সহধর্মিণী ও বঙ্গবন্ধুর বোন আমেনা বেগম, পুত্রবধূ সাহান আরা বেগম, কন্যা বিউটি সেরনিয়াবাত, হামিদা সেরনিয়াবাত, পুত্র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত, ক্রিডেন্স শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য খ.ম জিল্লুর রহমান, ললিত দাস, রফিকুল ইসলাম ও সৈয়দ মাহমুদ।

জীবিত অবস্থায় (২০১৮ সালে) জনকণ্ঠের এ প্রতিনিধির সঙ্গে সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপির সহধর্মিণী সাহান আরা বেগম বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ফজরের সময় অতর্কিত হামলায় কেঁপে উঠে ঢাকার ২৭ নম্বরের মিন্টো রোডের বাড়ি। সেদিন ফজরের আজানের সময় গুলির প্রচন্ড শব্দে হঠাৎ আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার শাশুড়ি (বঙ্গবন্ধুর বোন আমেনা বেগম) বলেন, বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, আমার ভাইকে (বঙ্গবন্ধু) ফোন দাও। তখন আমার শ্বশুর আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বঙ্গবন্ধুকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু কী কথা হয় তা আমরা জানি না।

সাহান আরা বেগম আরও বলেছিলেন, এরইমধ্যে আমি শেখ ফজলুল হক মনি ভাইকে ফোন করলাম। ফোনে তাকে বললাম, আমাদের বাড়ির দিকে কারা যেন গুলি করতে করতে আসছে বুঝতে পারছি না। মনি ভাই বলেন, কারা গুলি করছে দেখো। বললাম বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ আমাদের দরজা ভাঙ্গার শব্দ পেলাম। ঘাতকরা বাড়ির দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা রুমে প্রবেশ করে হ্যান্ডস আপ বলে আমাদের সবাইকে কর্ডন করে নিচতলার ড্রইংরুমে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাখে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাহান আরা বেগম বলেছিলেন. সিঁড়ির অর্ধেক নেমেই বাবু (সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত) বলে, মা আমি তোমার কোলে উঠব। আমি ওকে কোলে নিতে পারলাম না। শহিদ ভাই বাবুকে কোলে নিল। পরে নিচে নামার পর অস্ত্র ঠেকিয়ে ওরা (ঘাতক) আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ওপরে আর কে কে আছে? এমন সময় আমার শ্বশুর আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন তার চোখের ইশারায় আমি বললাম, ওপরে আর কেউ নেই। যে কারণে ওপরের রুমগুলো তল্লাশি না হওয়ায় ঘাতকরা আমার স্বামীকে (আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ) খুঁজে পায়নি।

পরবর্তীতে ঘাতকরা ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। আমরা মাটিতে পড়ে যাই। আমি আমার শ্বশুরের পেছনে ছিলাম, আমার কোমরে গুলি লাগে। ব্রাশ ফায়ারে ছয়জন মারা যায়। আমরা গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কয়েকজন কাতরাচ্ছিলাম। এরমধ্যে আবার একদল লোক গাড়ি নিয়ে আসে। তখন ভাবলাম এইবার বুঝি আর রক্ষা হবে না। কিন্তু পরে দেখি রমনা থানার পুলিশ এসেছে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
error: এই সাইটের নিউজ কপি বন্ধ !!
Website Design and Developed By Engineer BD Network