শিরোনাম
রাঙ্গাবালীতে নলকূপ থেকে বের হচ্ছে গ্যাস, এলাকায় কৌতূহল মাদারীপুরে ঘরে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা বরগুনায় নদীতে ভেসে এল ৩০ ফুট লম্বা তিমি অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাঃ অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেল শেবাচিমের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী বরিশালে ময়লার স্তূপ থেকে দুই নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে শপথ নিলেন খলিলুর রহমান বেতাগীতে সেতু আছে, পথ নেই, ঝুঁকি নিয়ে পারাপার বাবুগঞ্জে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের বাড়িতে অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, জিম্মি করে মালামাল লুট গুঠিয়া বিএনপি কার্যালয়ে ডাবল স্ট্যান্ডঃ আ.লীগ নেতাদের আপ্যায়ন, বিএনপি নেতাদের শায়েস্তা

কুয়াকাটায় ২০০ বছরের পুরনো নৌকাটি অরক্ষিত

আপডেট: March 16, 2021

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

অনলাইন ডেস্ক: কুয়াকাটা সৈকতের বুক চিরে জেগে ওঠা অন্তত ২০০ বছরের পুরাতন প্রাচীন পাল তোলা সেই নৌকাটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়নি গত আট বছরেও।রহস্যঘেরা নৌকাটি ২০১৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সহায়তায় কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার সংলগ্ন বেড়িবাঁধের পাশে স্থাপন করে। সেই থেকে এখনও অরক্ষিতই রয়ে গেছে। নেই সীমানা প্রাচীর কিংবা রাত্রিকালীন আলোর ব্যবস্থা।

স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষরা এই নৌকাযোগে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে আসার দাবি করলেও নৌকাটি তাদের জমিতে স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছে। রাখাইনদের জমি দাবি করে প্রাচীন এই নৌকাটি সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে বিভিন্ন সময় উদ্যোগও নেয় তারা।

পর্যটকদের ব্যাপক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নৌকাটি ২০১২ সালে জেলেদের মাধ্যমে স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে আসে। কুয়াকাটা সৈকতের জিরোপয়েন্ট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরত্বে পূর্বদিকে বালুর বুক চিরে নৌকাটি তখন সামান্য বেরিয়ে আসে।

এরপর সংবাদকর্মীরা এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নজর দেয়। তাদের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় পরিদর্শন শেষে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে এটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় তারা। এরপর ফরাসি নৌকা বিশেষজ্ঞ ইভাস মারের নেতৃত্বে একটি টিম নৌকাটি বালুর নিচ থেকে উত্তোলনে কাজ শুরু করে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর টেকনিক্যাল সহায়তায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে সম্পৃক্ত করে ২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রেললাইনের স্লিপারে তুলে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বৌদ্ধবিহারের পাশে প্রতিস্থাপন করা হয়। পটুয়াখালী জেলা পরিষদ, কলাপাড়া উপজেলা ও পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বন বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, শিপইয়ার্ড, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পর্যন্ত নৌকাটি উত্তোলনের কাজে প্রত্যক্ষ সহায়তায় এগিয়ে আসে।

স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায় এবং প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮০-৯০ সাল পর্যন্ত নৌকাটি কুয়াকাটা সৈকতের একই স্থানে বালুর ওপর কিছু অংশ জেগে থাকতে দেখা যায়। পিতলের পাতে মোড়ানো নৌকার বিভিন্ন অংশ স্বর্ণের পাত ভেবে তখন দর্শনার্থীরা খুলে নিয়ে যায়। মানুষের মুখে মুখে ‘সোনার নৌকা জেগে ওঠার’ গুজব ছড়িয়ে পড়ায় তখনও সেখানে নৌকাটি দর্শনে অসংখ্য মানুষের ভিড় দেখা গেছে।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের জলোচ্ছ্বাসে এটি আবারও বালুর নিচে চাপা পড়ে। একইভাবে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বালু সরে গিয়ে পুনরায় দৃশ্যমান হয় নৌকাটি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় এবং খুলনা আঞ্চলিক অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৭২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থের নৌকাটি তৈরি করা হয় অন্তত ২০০ বছর আগে। স-মিল বা আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় তখনকার সময় ছেনি বা কুঠার দিয়ে তেমন কোনো ফিনিশিং ছাড়াই তৈরি করা হয় এই নৌকা। ব্যবহার করা হয়েছে গর্জন অথবা শালকাঠ। পুরো একটি গাছ দিয়েই তৈরি করা হয় নৌকার বাহা, গছা ও গুড়ার কাজ।

তবে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের রসায়নাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে নৌকাটি জাম্বুল কাঠের তৈরি বলে দাবি করা হয়েছে। ইঞ্জিনের ব্যবহারের পরিবর্তে পাল তোলার ব্যবস্থা থাকা নৌকাটিতে পাতাম বা গজাল লোহার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে লোহার রড-বোল্ট। এরপর নৌকার বাইরে মোড়ানো হয় পিতল ও তামার সোনালি সিট।

নৌকা বিশেষজ্ঞ ফরাসি নাগরিক ইভাস মারের মতে, এটি সমুদ্রগামী ছোট্ট পাল তোলা জাহাজ (schooner)।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিশেষজ্ঞ দলের ধারণা, ৯০ টন ওজনের এই নৌকাটি ২০০ বছর বা তারও অধিক পুরনো, এটি রাখাইনদের তৈরি নৌকা হতে পারে। পর্তুগিজ জলদস্যুদের ব্যবহৃত নৌকা হতে পারে বলেও কেউ কেউ ধারণা করছেন।

নৌকা থেকে উদ্ধার করা হয় তামার তৈরি পেরেক, নারিকেলের মালাই, নারিকেলের ছোবলা দিয়ে বানানো রশি, ভাঙা মৃৎপাত্রের টুকরো, প্রচুর ধানের বহিরাবরণ/চিটা, পাটকাঠি, মাদুরের অবশেষ, পাটের তৈরি ছালার নিদর্শন, লোহার ভারি ও বিশালাকৃতির শিকল। যার মধ্যে বেশ কিছু নিদর্শন বর্তমানে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরে প্রদর্শিত রয়েছে।

কুয়াকাটার কেরানীপাড়া রাখাইন নেতা উচাচিং মাতুব্বরের ভাষ্যমতে, এই নৌকা তাদের পূর্বপুরুষরাই আরাকানে বসে তৈরি করেছে। এরপর এমন অন্তত ৫০টি নৌকাযোগে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে এসে ১৭৮৪ সালে বাংলাদেশের কুয়াকাটাসহ বেশ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

নৌকাটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১০৬ বছর বয়সী কুয়াকাটার প্রবীন নাগরিক শেখ আ. আলী যুগান্তরকে বলেন, ১৯৮০ সালের পর কুয়াকাটা সাগরপাড়ের পূর্বদিকে তিন কিলোমিটার দূরে একটা সোনার নৌকা ওডার (ওঠার) খবর হুইন্যা আমরা দেখতে যাই। তহন পুরাপুরি নৌকাডা বালির ওপরে ভাসে নাই। এর কয়েক বচ্ছর পর আবার বালির নিচে তলাইয়া যায়। পরে আবার যহন পাওয়া যায় তহন বুজ্জি এই নৌকাই হেই নৌকা।

কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষায় পড়ুয়া শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান সৈকত হতাশা প্রকাশ করে বলেন, নৌকাটি উদ্ধার করা হয়েছে গত প্রায় আট বছর আগে। অথচ এখনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

উত্তোলন টিমের সদস্য বিশিষ্ট সাংবাদিক মোরশেদ আলী খান বলেন, নৌকাটি সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে পুরাতন ঐতিহ্যকে তুলে ধরার প্রয়াসে আমরা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে সেদিন বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম। এখন যথাযথভাবে এটি সংরক্ষণের সম্পূর্ণ উদ্যোগ তাদের নিতে হবে।

খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দায়িত্বরত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা নৌকাটি অরক্ষিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, ইতোমধ্যে গণপূর্ত বিভাগের আওতায় নৌকাটির ওপরে একটি টিনের শেড নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে দেখভালের জন্য তিনজন লোক সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। আশা করছি আগামী জুনের মধ্যে সবকিছু একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসতে পারব।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
error: এই সাইটের নিউজ কপি বন্ধ !!
Website Design and Developed By Engineer BD Network