আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০২৬
বুলবুল ইসলাম:: মাটি ভরাট, গাইডওয়াল নির্মাণ রাস্তায় ঘাস লাগানোসহ ৯ দশমিক ৮০০ মিটার সড়কের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৬৯ টাকা। প্রতি কিলোমিটার সড়কের ব্যয় যেখানে প্রায় এক কোটি ৫৭ লাখ টাকারমত। সোনায় মোড়ানো এই সড়কের কাজের মেয়াদ শেষ হলেও নির্মাণ হয় নি রাস্তা। মোট কাজের শেষ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ কাজ। তবে ঠিকাদারকে বিল দিতে কারপন্য করেনি উপজেলা প্রকৌশলী। কাজে নানা অনিয়েমের অভিযোগ থাকা সত্বেও এখন পযর্ন্ত বিল দেয়া হয়েছে প্রায় ৫৫% শতাংশ।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরএবি-আরসি-বিসি-এইচটি জেভি এর বিরুদ্ধে উঠেছে পুরাতন গাইডওয়াল তুলে নিয়ে নতুন গাইড ওয়াল না করা, মাটি ভরাটের কাজ সঠিকভাবে না করা, দায়সারাভাবে সড়কের প্রশস্ত না বাড়ানোসহ একাধিক অভিযোগ। এমন ঘটনা ঘটেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর আওয়াধীন কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার ‘কুড়িগ্রাম হরিকেশ মোড় আরএইচভি থেকে কাঁঠালবাড়ি জিসি ভায়া হলোখানা ইউসিপি সড়ক’ প্রকল্পে।
সড়ক নির্মাণের ধীরগতি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতাকে সবকিছুর জন্য এলাকাবাসী দাবি করছে এলজিইডি কর্মকর্তাদের। এলাকাবাসী বলছে এলজিইডি কর্মকর্তাদের নিষিক্রয়তার কথা। তাদের দাবি যদি এলজিইডি কতৃপক্ষ কাজটি সঠিকভাবে তদারকি করতো তাহলে কাজের এতো অনিয়ম হতো না এবং এতো দিন কাজটি শেষ হয়ে যেত। এলাকাবাসী বলছে এতো বড় কাজের মধ্যে তারা গাইড ওয়াল তুলে নিয়ে গেলেও সেখানে আর গাইড ওয়াল নির্মাণ করেনি। ডাব্লিলএমএম সড়কে ব্যবহার করেছে নিম্নমানের ইট খোয়া। এমন কী রেজিং ( সড়ক সীমানায়) ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের ইট।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি কাজ শুরু হয়েছিলো ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ। আর শেষ হওয়ার কথা ছিলো চলতি বছরের জুন মাসের ৩০ তারিখ। প্রকল্পটিতে ১১ হাজার ৬১৫ মিটার বক্সকাটিং( রাস্তার পাশবাড়ানো) ও ১ হাজার ৬০৭ মিটার গাইড ওয়াল (প্যালিসাইডিং ওয়ার্ক) রয়েছে। যেখানে গাইড ওয়াল এর মধ্যে প্রথম ধাপে গাইড ওয়ালের পুরুত্ব ১৫ ইঞ্চি উচ্চতা ২০ ইঞ্চি, দ্বিতীয় ধাপে পুরুত্ব ১০ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ২০ ইঞ্চি হওয়ার কথা। পুরো সড়কটি নির্মাণ হওয়ার কথা ছিলো ডাব্লিউএমএম (ওয়েট মিক্স ম্যাকাডাম) নিয়ম অনুসারে। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ এই সড়কে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের খোয়া যা গাইড ওয়াল থেকে তুলে ভেঙ্গে পরবর্তীতে খোয়া বানানো হয়েছে। দীর্ঘ দিন সড়কটি ফেলে রাখার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে পরিবেশদূষণ।
সড়কের নির্মাণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই সড়কে প্রথম শ্রেণীর ইট ব্যবহারের কথা। মাটি ও বালু ভরাট করার পর প্রথম ধাপে প্রথম শ্রেণীর অথবা পিকেট ইট দিয়ে প্রথম ধাপে প্রতি খোয়া ১ দশমিক ৫ ইঞ্চি খোয়া এবং পরের ধাপে ১০ মিলি খোয়া দেওয়ার কথা কিন্তু এসব নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাবি এলাকাবাসী। এমন কী সড়ক সিমানা( রেজিং) এ নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করছে তারা।
সরেজমিনে, হরিকেশ মোড় থেকে বাউদিয়ার ছড়া, খলিফার মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ডাব্লিউএমএম সড়কের বেহাল দশা। নিম্নমানের খোয়া ব্যবহারের করার কারনে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ধূলোবালি। আর দীর্ঘদিন সড়কের কাজ না হওয়ার কারনে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে বায়ু। সড়কের আশেপাশের জমিতে করা যাচ্ছে না শাক- সবজির চাষাবাদ।
সুভারকুটি এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে বাঁশঝাড় আর এই বাঁশঝাড়ের নিচে ছিলো ১০ থেকে ১৫ ইঞ্চির গাইড ওয়াল। সেগুলো ঠিকাদারের লোকজন তুলে নিচে। আমরা যখন তাদের বলছিলাম কেন এই ইট তুলছেন তখন তারা বলছিলো এখানে নতুন গাইড ওয়াল হবে। এখন রাস্তার কাজ প্রায় শেষ গাইড ওয়াল কখন দিবে’। তিনি আরো বলেন, ‘ যে কাজ হইছে রাস্তায় কখন যে ভাঙ্গি পরে কে জানে।’
প্রতিবেদকের সাথে আশরাফুলের কথা বলা দেখে ছুটে আসেন সাইদুর রহমান। নির্মাণাধীন সড়কের পাশ দিয়ে রয়েছে তার একটি পুকুর। যা চাঁন্দের পুকুর নামে পরিচিত। এই পুরুরের গভীরতা প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফিট। সাইদুর বলেন, ‘ আমার পুকুরের পাশে দিয়ে প্রায় ১৯০ ফিট দৈর্ঘ্য একটা গাইড ওয়াল ছিলো। সেই ওয়াল ঠিকাদারের লোকজন তুলে নিয়ে গেছে। বলছে নতুন গাইড ওয়াল করে দিবে। কিন্তু এখন তারা বলছে গাইড ওয়াল ধরা নাই । যদি গাইড ওয়াল ধরা নাই থাকে তাহলে তারা তুলনো কেন। এখন তো রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার আগেই দুই বার মাটি ভেঙ্গে নিচে নেমে গেছে। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই এই রাস্তা ভেঙ্গে যাবে।’
একই এলাকার বাসিন্দা আমিনুর কাঠ মিস্ত্রী বলেন, ‘ গাইডওয়ালের ইট ওমরা ট্রাক্টর দিয়া নিয়া গেছে। দুই- তিন দিন ভরা ওমরা ইট তুলি তুলি নিছে। আর ঐ ইট দিয়া ওমরা খোয়া করছে। সেই খোয়ারও অবস্থা ভালো না।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, আরএবি-আরসি-বিসি-এইচটি যৌথ উদ্যোগে কার কাজটির হামিদ ট্রেডার্স (এইচটি) এর স্বত্তাধিকারী হামিদ বলেন, ‘ আমরা কাজটি ভালোমত করছি। আমাদের কাজে কোনো গাফিলতি নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘ তবে নিউজটা আপনারা করলে আমাদের ক্ষতি হবে। তদন্ত হবে।’
যা বলছে এলজিইডি: সড়কের নির্মাণ কাজ কত শতাংশ হয়েছে কাজের মাস কেমন হয়ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রকৌশলী ফিরোজুর রহমান বলেন, ‘ আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পরিপূর্ণ কাজ বুঝে নিয়ে বিল দিয়েছি। এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ৬০ শতাংশ আর তার অনুকূলে বিল দেয়া হয়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইউনুছ হোসেন বিশ্বাস বলেন, ‘ সাধারণত আগে আমরা ঠিকাদারদের গাইড ওয়াল করার পরামর্শ দেই যাতে করে রাস্তার কাজটি ভালো হয়। আমি নিজেও সাইটটিতে গিয়েছি এবং একজন লোককে তদারকির জন্য নিযুক্ত করেছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ যেখানে যেখানে গাইড ওয়াল ধরা আছে ঠিকাদারকে তা নির্মাণ করতে হবে। কাজ না করে বিল নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ মানহীন খোয়া সেড নির্মাণ সুপেয় পানি পানের ব্যবস্থা করা হয় নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ আমি এখানে নতুন নিযুক্ত হয়েছি, বিষয়গুলো আমাকে আরো খতিয়ে দেখতে হবে।’

