আপডেট: জানুয়ারি ১, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্টার : বরিশালের দুর্গম জনপদ হিসেবে পরিচিত হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা এবং প্রশাসনিক থানা কাজিরহাট নিয়ে গঠিত বরিশাল-৪ সংসদীয় আসন। মেঘনা, কালাবদর ও তেতুলিয়া নদীবেষ্টিত এই দুই উপজেলা বরিশালের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বরাবরই একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদায়ী বছরজুড়ে এ আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নানামুখী তৎপরতা চোখে পড়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তারা হলেন, বিএনপির রাজিব আহসান, জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সৈয়দ এছহাক মোঃ আবুল খায়ের, বাংলাদেশ জাসদের আবদুস ছালাম (খোকন) এবং মুক্তি জোটের মোঃ আব্দুল জলিল।
তবে বছরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মূলত বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী। বাকি দুই প্রার্থীর নাম শোনা যায় মূলত মনোনয়ন দাখিলের পর।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বছরের শুরু থেকে মাঠ পর্যায়ে বিএনপির উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রায় অর্ধডজন নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি রাজিব আহসান এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ।
দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে কেন্দ্রীয় বিএনপি প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় বরিশাল-৪ আসনে রাজিব আহসানের নাম ঘোষণা করে। এতে মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয় এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টি হয়। বিএনপির দুর্দিনের নেতা হিসেবে পরিচিত সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকা পুনর্বিবেচনার জন্য কেন্দ্রীয় বিএনপিতে আবেদনও করেন।
শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে রাজিব আহসান মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও দুই উপজেলায় বিএনপির একটি বড় অংশের নেতাকর্মী এখনও নির্বাচনী মাঠে অনুপস্থিত। মনোনয়ন বঞ্চিত কেউ, এমনকি সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে রাজিব আহসানের পক্ষে মাঠে নামেননি।
বিদায়ী বছরের ১৩ জুলাই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরিশাল-৪ আসনে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব ও চরমোনাই পীরের ভাই মুফতী সৈয়দ এছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়েরকে। তবে তিনি সরাসরি মাঠে তৎপরতা শুরু করেন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনসহ ইসলামী ও সমমনা দল সমূহের সম্ভাব্য আসন সমঝোতা আলোচনায় নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে শেষ সময়ে মাঠে নামেন তিনি।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী বিদায়ী বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলা আমির ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক মাওলানা আবদুল জব্বারকে এ আসনের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে। প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই তিনি মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা ও কাজিরহাটের প্রতিটি জনপদে ধারাবাহিক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রার্থী ঘোষণার আগ থেকেই আব্দুল জব্বার মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই এ অঞ্চলে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের সুবাদে স্থানীয়দের সঙ্গে তার একটি দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
বিগত রমজান মাসে তিনি প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেন, যেখানে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি অসহায় এতিম শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দায়িত্ব গ্রহণ, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল স্থাপন, মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণে সহায়তা এবং ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজনসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
এছাড়াও গরিব ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা, ঈদ সামগ্রী ও কোরবানির গোশত বিতরণসহ বছরজুড়ে সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে সক্রিয় থাকার কারণে জামায়াত প্রার্থীর উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশি দৃশ্যমান ছিল, যা বিএনপির প্রার্থীর ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি বছরের শেষদিকে মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ায়।

